
কেমন হয় যখন ঘুম থেকে উঠেই উপলদ্ধি করবেন স্নিগ্ধ সকালের নির্মল শিরশিরে বাতাস, আর চোখ জুড়াবেন আপনার তৈরি সবুজ উদ্যানে তাকিয়ে! সবুজ বাগানই হবে তা তো কথা নয়, বরং আপনি একটি সবুজ ব্যালকনি তৈরি করে নিতে পারেন। কারি পাতা, ক্যাকটাসের চারা অথবা দুর্বা ঘাসের ছোট্ট ছোট্ট আস্তরন দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন আপনার ঠিকানা।
বাগান অনেক ধরনের হয়ে থাকে। বাড়ীর পার্শ্ববর্তী ভূমি, ভবনের ছাদ অথবা গ্রীনহাউজের মাধ্যমেও বাগান তৈরী করা সম্ভবপর। জলদ বাগান পুকুর কিংবা সেঁতুর শোভাবর্ধনে তৈরী করা হয়। এতে মূলতঃ শাপলাসহ জলজ উদ্ভিদের সংমিশ্রণ ঘটে। বাড়ীর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, থিম পার্কে বাগান তৈরী করা হয়। সাধারণতঃ এ ধরনের বাগান দেখাশোনা, পরিচর্যার জন্যে মালী বা উদ্যানরক্ষকের প্রয়োজন পড়ে। এজাতীয় বাগানে প্রবেশের জন্যে অনেক সময় দর্শনী ধার্য্য করা হয়। ব্যক্তিগত বাগান মূলতঃ বিনোদন বা শখের নিমিত্তে যা ব্যবসায়ের জন্যে নয়।

ব্যক্তি পর্যায়ে বাগানের আয়তন মাত্র কয়েক বর্গমিটারের হতে পারে। নকশার উপর নির্ভর করে খসড়াভাবে বাগানকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আনুষ্ঠানিক এবং প্রাকৃতিক বাগান।
আমাদের খুবই পরিচিত একটা ফুল হলো বাগান বিলাস. আমদের দেশের মোটামুটি প্রায় সব জায়গায় এই গাছ চোখে পড়ে। বিশেষ করে বাড়ির সামনের গেট অথবা পার্কে, বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে এই গাছের ফুল। লাল, কমলা, হলুদ, সাদা, গোলাপী, আরো কত রং…! আমরা এই ফুলকে বাগান বিলাস ফুল, কাগজ ফুল, কাগজি ফুল প্রভিতি নামে চিনি। নাম শুনে এদেশি মনে হলেও বাগান বিলাস মূলত বিদেশি ফুল। নামের মতোই দেখতেও অনিন্দ্য সুন্দর এই ফুল। পৃথিবী ব্যাপি বাগান বিলাসের ১৮টি পর্যন্ত প্রজাতির সন্ধান মেলে।
দক্ষিন আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, আর্জেন্টিনা এই দেশগুলোকে আমাদের বাগান বিলাসের আদি নিবাস বলে ভাবা হয়। বাংলাদেশের মাটি,জলবায়ু আর মানুষের সাথে বাগান বিলাস এমনভাবে মিশে গেছে যে, এখন এই সময়ে এসে এই ফুলকে দেখলে কোনকালে যে এটা বিদেশি ফুল ছিল বা দেশী ফুল ভিন্ন কিছু ছিল তেমনটা আর মনে হয় না। English Name: Bougainvillea; Scientific Name: Bougainvillea glabra; Family: Nyctaginaceae
প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেয়া প্রথম ফরাসী নাবিক লুইস এ্যানিত্দয়োন বোগেনভিলের নামে এই ফুলের নামকরণ করা হয়। ১৮ শতকে তিনি ব্রাজিলে ফুলটির সন্ধান পান। আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা হলেও, এখন পৃথিবীজুড়ে দেখা যায় বাগান বিলাস। এর অজস্র প্রজাতি। এখন পর্যন্ত ফুলটির প্রায় ৩শ’ জাত আবিষ্কৃত হয়েছে। ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, আমেরিকা, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, গ্রীস, স্পেন, সিঙ্গাপুর, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ডের আবহাওয়া বাগান বিলাসের জন্য বিশেষ উপযোগী বলে জানা যায়। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের পরিবেশও ফুলটির জন্য খুব অনুকূল। এখানে দীর্ঘকাল ধরে আছে বাগান বিলাস। প্রচুর পরিমাণে হয়।
শখের বাগান বিলাসীদের পছন্দের তালিকায় Culver’s root নাম উপরের সারিতে দেখা যায়। বাগান সাজাতেCulver’s root অনবদ্য ভুমিকা রাখে। এর অপরুপ সাদা রঙের ফুল- মৌমাছি, ভ্রমর ও অন্যান্য পোকা- মাকড়দের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বাগানের স্নিগ্ধ পরিবেশ নিশ্চিত করতে Culver’s rootঅনন্য।

Culver’s root সব ঋতুতে বোপন উপযোগী কিন্তু শীতে রূপের ছটা প্রকাশিত হয় বেশী।
সমস্ত উপকারী পোকা মাকড়, মৌমাছি, ভ্রমর ও কীট পতঙ্গ এর প্রেমের তীর্থস্থান যেন mountain mint এর বাগান। আমেরিকার নিজস্ব এই গাছটি প্রায় সব ভুমিতে চাষাবাদ যোগ্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রভূত ভুমিকা পালন করে। mountain mintএর ফুলের আকর্ষণে কীট পতঙ্গের সাথে সাথে পাখিদের ভিতরেও প্রেম জেগে উঠে।

বাংলাদেশের অতি পরিচিত একটি ফুল হলো দোলনচাঁপা। বর্ষাকালীন ফুলগুলোর মধ্যে দোলনচাঁপা অনেকেরই খুব পছন্দের। দোলনচাঁপার আয়ু খুব কম সময়ের জন্য হলেও এর মনোলোভা সুগন্ধের কারণে ঘরের কোণে ফুলদানীতে এই ফুল শোভা পায় শৌখিনদের বাড়িতে। দোলনচাঁপার মোট প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৪০টি! সাদা ছাড়াও কোনো কোনোটির রং হলদেটে বা লালচে রঙের হয়। আবার কোনো কোনো ফুলে থাকে গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের ছিটে।

বৈজ্ঞানিক নাম Hedychium coronarium
পরিবার Zingiberaceae
পরিবার Zingiberaceae
কাঠ মালতী (Kath Maloti )।মালতী নাম হলেও এটি টগরগোত্রের ফুল। কাঠ মালতি আর টগর একই ফুল। শুধু মাত্র দেখতে একটু আলাদা এই যা।
গাছ, পাতা সবই দেখতে একই রকমঅতি সুন্দর এই ফুলটিতে পাঁচ টি পাপড়ী থাকে, মনে একটু বাতাস লাগলেই ঘুরতে শুরু করবে। সবুজ পাতার মাঝে সাদা ফুলগুলিকে দেখতে খুব ভালো লাগে। এটি সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষার ফুল। এবং ইংরেজিতে বলে Banana bush ।কাঠ মালতীর গাছ গুলি ঝোপের আকারে হয়। সাধারণত দুই মিটারের বেশী উচু হয় না।বৈজ্ঞানিক নাম Tabernaemontana Pandacaqui পরিবার Apacynaceae
ছাদে বাগান করার বিভিন্ন পদ্ধতি :
টব পদ্ধতি : খুব সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানাš-র করা যায় বলে টব ছাদ, আঙিনা ও ব্যালকণীর জন্য সর্বোত্তম বাগান পদ্ধতি বলে বিবেচিত। দিনদিন টব পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে আজকাল প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের টব তৈরি করা হচ্ছে এবং এসব টবের ব্যবহার দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। টবে চাষ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করা উচিত। ১৪ ইঞ্চি থেকে ১৮ ইঞ্চি আকারের একটি টবের জন্য জৈব সারের পাশাপাশি ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৫০ গ্রাম এমওপি সার উত্তমরূপে মিশিয়ে ১০ দিন থেকে ১২ দিন রেখে দিতে হবে। তারপর টব ভরাট করতে হবে।
হাফড্রাম পদ্ধতি : টব পদ্ধতি ও হাফড্রাম পদ্ধতির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। হাফড্রামের তলদেশে ছিদ্র করতে হবে। ছিদ্রগুলোয় ইটের টুকরো বসাতে হবে; তার উপরে ড্রামের তলদেশে প্রথম ১ ইঞ্চি পরিমাণ খোয়া বা সুড়কি দিতে হবে এবং তার উপরে এক ইঞ্চি পরিমাণ জৈব সার বা পচা গোবর দিতে হবে। এর ফলে অতিরিক্ত পানি সহজেই বের হয়ে যেতে পারবে। জৈব সারের পাশাপাশি প্রতিটি ড্রামে ২০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি ব্যবহার করা যেতে পারে। আম ও লেবু জাতীয় গাছের জন্য প্রতিটি ড্রামে উপরোক্ত জৈব ও রাসায়নিক সারের পাশাপাশি ৫০০ গ্রাম হাড়ের গুঁড়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্থায়ী বেড পদ্ধতি :
স্থায়ী বেড পদ্ধতি হল স্থায়ীভাবে ছাদে বাগান করা। ছাদে বাগান করার পূর্বে ছাদ বিশেষভাবে ঢালাই দিয়ে নেট ফিনিশ করে নিতে হবে। এর দু’টি পদ্ধতি আছে।
ছাদের চারদিকে স্থায়ী বেড পদ্ধতি :
ছাদে বাগান করার জন্য স্থায়ী বেড পদ্ধতি একটি আধুনিক পদ্ধতি। স্থায়ী বেড পদ্ধতির বাগান করার জন্য ছাদের চারিদিকে ২ ফুট প্রস্থের দুই পাশে ১.৫ ফুট উঁচু দেয়াল ৩ ইঞ্চি গাঁথুনির নেট ফিনিশিং ঢালাই দিয়ে তৈরি করলে মাঝখানে যে খালি জায়গা তৈরি হয়, সেই খালি জায়গার তলায় প্রথমে এক ইঞ্চি ইটের সুড়কি বা খোয়া, পরের এক ইঞ্চি গোবর সার দেয়ার পর বাকি অংশ ২ ভাগ মাটি ও ১ ভাগ গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করে স্থায়ী বেড তৈরি করা হয়।
ট্যাংক পদ্ধতি:
ছাদে এক ফুট উঁচু ৪টি পিলারের উপর পানির ট্যাংক আকৃতির ৩ ফুট দৈর্ঘ্য, ২ ফুট প্রস্থ ও ১.৫ ফুট উঁচু ৩ ইঞ্চি গাঁথুনির নেট ফিনিশিং ঢালাই দিয়ে যে ট্যাংক তৈরি করা হয় একেই বলে ট্যাংক বেড পদ্ধতি।
ছাদে গাছ লাগানোর কৌশল :
গাছের ধরন অনুযায়ী ড্রাম/টব নির্বাচন করে সার-মাটি দিয়ে গাছ লাগাতে হবে। ডাইথেন এম-৪৫ অথবা এ জাতীয় ছত্রাকনাশক ছাই এর সাথে মিশিয়ে মাটিতে প্রয়োগ করে মাটি শোধন করা যায়। মাটি শোধন করে আদর্শ নার্সারি থেকে চারা, কলম, কাটিং, বীজ সংগ্রহ করে নিজেই টবে লাগালে খরচ কম হবে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসের মধ্যে ড্রাম বা টবের মাটি বদলাতে হবে। ড্রামে বা টবে ইউরিয়া সার না দেয়াই ভাল।
এত পরিশ্রমের পরে নিজের বাগানে যখন ফুল ফল আসে তখন মন খুশিতে ভরে ওঠে। গাছের যত্ন একজন করলেও ফসলের খুশি পৌঁছে যায় সবার কাছে। যান্ত্রিক জীবনে সবুজের আনন্দ ছুঁয়ে যাবে সকলের হৃদয়। ধোঁয়া দূষণের শহরে প্রতিটি বাড়ির ছাদ হবে একটি করে অক্সিজেনের ছোট্ট কারখানা। এভাবেই হয়তো দূষণ থেকে শহরকে রক্ষা করার সামান্য একটি অবদান রাখতে পারি আমরা।
COMMENTS