বয়সটা যেহেতু দুরন্তপনার, নিয়ম ভাঙার হুজুগ তো একটু থাকেই। সেই সঙ্গে এই বয়সে খাওয়াদাওয়া ও শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়ার দিকেও থাকে মনোযোগের অভাব। ফলে দেখা যায় একটু বয়স বাড়লেই দেহের ত্বক, চুল ইত্যাদি হারিয়ে ফেলে এদের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। স্কুল, কোচিং, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বাইরে খাওয়া, ঘুরে বেড়ানো—কিশোরীদের দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটে দারুণ হুলুস্থুল ও ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। সারা দিনের ধুলোবালি, ত্বকে জমা তেল, ঘাম ইত্যাদির পর রাতে ত্বকেরও প্রয়োজন হয় একটু আলাদা যত্নের। এই বয়সে খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। প্রতিদিন রাতে অত্যন্ত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় দিলেই হবে। ত্বকের এই যত্ন নেওয়া শুরু করতে হবে ত্বক প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ, স্বাভাবিক, উজ্জ্বল থাকার সময় থেকেই, অর্থাৎ কিশোরী বয়স থেকেই।
নিত্যদিনের খাওয়াদাওয়া, ঘুমের মতো রাতে ত্বকের যত্নে কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের অভ্যস্ত করে ফেললেই হবে। রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন এই কিশোরী বয়সে প্রতিদিনকার ত্বকের যত্নের জন্য ত্বক পরিষ্কার, ময়েশ্চারাইজ করা, হাত-পায়ের যত্ন, চুলের যত্ন প্রভৃতির ওপর জোর দিতে বলেছেন। নিচে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ত্বক পরিষ্কার
কিশোরী বয়সে মেকআপ করা উচিত নয়। তবে কেউ করে থাকলে, মেকআপ না তুলে কোনোভাবেই ঘুমাতে যাওয়া যাবে না। এটি সব বয়সীর জন্য বাধ্যতামূলক হলেও কিশোরী বয়সে বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে। এই বয়সের ত্বক বেশি সংবেদনশীল থাকে। মেকআপ দেওয়া না থাকলেও শোবার আগে মুখ পরিষ্কার করে ধুতে হবে। ফেসওয়াশ বা ক্লিঞ্জিং মিল্ক দিয়ে ভালো করে মুখের ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। প্রতিদিনই করতে হবে। এতে করে মুখের ত্বকে বাইরের ধুলোবালি ও ময়লা থেকে আসা ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক বাসা বাঁধতে পারবে না। ত্বক থেকে নিঃসৃত অতিরিক্ত তেলও জমবে না। লোমকূপগুলোর মুখ পরিষ্কার থাকায় ত্বক উজ্জ্বল থাকবে।
ফেসওয়াশ বা ক্লিঞ্জিং মিল্কের পরিবর্তে চালের গুঁড়ো, বেসন ও শসার রস দিয়ে ঘরে তৈরি ক্লিঞ্জিংও ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে উপকার বেশি হবে।
সেই সঙ্গে সপ্তাহে এক দিন অথবা দুদিন ত্বকে টোনিং করতে হবে। কাঁচা দুধ অথবা ডাবের পানি দিয়ে টোনিং করা যায়।

সুস্থ ও সুন্দর ত্বকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পানি। সাধারণত ত্বকের ভেতরের অংশ থেকে পানি ওপরের স্তরে এসে ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখে। ত্বকে পানির অভাব হলেই ত্বক হয়ে পড়ে শুষ্ক ও খসখসে। ময়েশ্চারাইজার ত্বকের নিচের স্তর থেকে পানিকে ওপরের স্তরে আনার কাজ করে থাকে। প্রতি রাতেই ত্বক পরিষ্কার করার পরে মুখে ময়েশ্চারাইজার লোশন লাগাতে হবে। মুখের ত্বকের জন্য ক্রিম ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখুন—
* ময়েশ্চারাইজার যেন অবশ্যই মুখের ত্বকের মানানসই হয়।
* ময়েশ্চারাইজারের ধরনটি হতে হবে হালকা, অর্থাৎ ঘন বা কোনো প্রকার তেলযুক্ত হওয়া চলবে না।

ঠোঁটঠোঁটের যত্নটা একটু আলাদা। কেননা, এর ত্বক সবচেয়ে কোমল। প্রতিদিন রাতে যাদের ঠোঁট ফাটে, তারা তো অবশ্যই, যাদের ফাটে না, তাদেরও উচিত আঙুল দিয়ে আলতো ঘষে ঠোঁট পরিষ্কার করে এতে লিপ বাম লাগিয়ে ঘুমানো।
চোখচোখের চারপাশের ত্বক মুখের ত্বকের তুলনায় পাতলা হয়। সে কারণে সম্ভব হলে ভিটামিন এ, সি, ই অথবা কে যুক্ত আই ক্রিম ঘুমানোর আগে ব্যবহার করা। এটি চোখের নিচের কালো দাগ দূর করে।
দাঁত
নিয়মিত রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। এতে দাঁতের ফাঁকে খাবারের কণা জমে থাকতে পারে না।
এ তো গেল ত্বকের বাহ্যিক পরিচর্যার কথা। রাতের বেলা ত্বকের পরিচর্যার পাশাপাশি খাবার গ্রহণের পরিমাণ ও সময়ের দিকেও রাখতে হবে। পরিপূর্ণ পরিচর্যা তখনই হবে যখন ত্বকের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুটোই সমান গুরুত্ব পাবে। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাজেদা আক্তার জানালেন, কিশোরী বয়সটাতে মেয়েদের খাবারে প্রোটিন ও আয়রন থাকতে হবে। এক গ্লাস দুধ ও একটি ডিম তো আবশ্যক। সেই সঙ্গে সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও গরুর/খাসির কলিজা খেতে হবে লেবু দিয়ে। এ ছাড়া যে কাজগুলো করা উচিত:
* রাত আটটার মধ্যে রাতের খাবারের পর্ব চুকিয়ে ফেলতে হবে।
* রাত আটটার পর থেকে ভারী খাবার খাওয়া যাবে না। পানিও পরিমাণে কম খেতে হবে।
* ১২টায় ঘুমালে, রাত ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে হালকা খাবার খেতে হবে। মিষ্টি জাতীয় যেমন: পুডিং, পায়েস, দুধ বা মিষ্টি দধি অল্প পরিমাণে খাবেন।
* রাতের খাবারের পর থেকে আধা গ্লাস-এক গ্লাসের বেশি পানি পান না করাই উত্তম।
* আট ঘণ্টা ঘুম এই বয়সে আবশ্যক।
* হাসিখুশি থাকা এই বয়সটাতে সবচেয়ে জরুরি। মানসিকভাবে যেমন প্রয়োজন, তেমনি হাসিখুশি থাকাটা শরীরের জন্যও উপকারী। কিশোরী বয়সে হাসিখুশি একটা মুখ। প্রাণবন্ত ও লাবণ্যময়ী হতে আর কী লাগে!

চুলের যত্নপ্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে চুল ভালো করে আঁচড়িয়ে বেঁধে ঘুমালে চুল দ্রুত বাড়ে। সুন্দরও থাকে। চুলে বেণি করেই ঘুমোতে হবে তা নয়, উঁচু করে জাপানিজ পনিটেইল অর্থাৎ ঝুঁটি করেও শোয়া যায়। চুল যদি কেউ একেবারেই বাঁধতে না চায়, তাহলে একটি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ঘুমোতে পারে। এটি চুলকে আগা ফাটা থেকে রক্ষা করবে। সেই সঙ্গে সকালে চুলে এনে দেবে একটা ওয়েভি ভাব। এতে চুল ঘন দেখাবে।
পানি চিকিৎসামুখে সজোরে, শব্দ করে একনাগাড়ে ২৫ বার পানির ঝাপ্টা দেওয়া। দিনে যতবার খুশি ততবার। প্রতিদিন করতে পারেন। চেহারার সতেজ ভাব ধরে রাখবে আজীবন।
প্রথম আলো থেকে

COMMENTS