অফিসে কাজের চাপে হাঁসফাঁস অবস্থা। বাড়িতেও স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি ঘটছিল। ভাইয়ের জটিল অসুস্থতায় একবারও দেখতে যেতে পারেননি বলে ভাই-ভাবি রুষ্ট হয়ে আছেন। সবই অনুভব করতে পারেন রায়হান, কিন্তু দৈনন্দিন জীবন এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে যে তিনি নিরুপায়। তাই গত রোজার ঈদে একটা লম্বা ছুটি পেয়ে ভাবলেন সংসার ও সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলো মেরামত করা দরকার। কয়েক দিন টানা স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটালেন, দুই দিনের জন্য একটা রিসোর্টে ঘুরেও এলেন। একটা সারা দিন খাবারদাবার নিয়ে কাটালেন বড় ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে। ভাই-ভাবির মনের মেঘ কেটে গেল বলেই মনে হলো। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। শেষ দিনে নিজের বাড়িতে ডাকলেন নিজের ও শ্বশুরবাড়ির ঘনিষ্ঠ স্বজনদের। ছুটি শেষে মনে হলো তাঁর, হ্যাঁ, সবাই খুশি। এমনকি তিনিও খুশি। ছুটির কয়েকটা দিন যেন পাখির ডানায় ভর দেওয়ার মতো করে উড়ে গেল। রায়হান তাই চেয়ে আছেন আবার কবে এমন একটা লম্বা ছুটি পাওয়া যাবে!

বড় দুটো ছুটি পাওয়া যায় দুই ঈদে—বলেন স্কুলশিক্ষক কাকলী চৌধুরী। ‘সাধারণত আমরা মেয়েরা চেষ্টা করি এই দুটো উৎসবকে আনন্দে ভরে দিতে। আমরা ভালোমন্দ রান্না করি, অতিথি আপ্যায়ন করি, স্বামী-সন্তানদের বিশেষ পদ খাওয়াতে চেষ্টা করি। কিন্তু আসলে পরিবারের পুরুষ ও অন্যদেরও এ সময় একটা দায়িত্ব আছে, যা গুরুত্বপূর্ণ।’ দায়িত্বগুলো পালন করতে এই সুযোগটা কাজে লাগানো যায়। যেমন তা হতে পারে সারা বছর খোঁজ না নিতে পারা স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, দেখা করা বা সম্পর্কগুলোকে ঝালাই করে নেওয়া। যে বাবা অন্য সময় সন্তানদের সময় দিতে পারেন না, তিনি এই সময় সন্তানের একটু কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করতে পারেন, তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। ছেলেমেয়েরা আজকাল বৃহত্তর পরিবার থেকে একটু দূরেই সরে যাচ্ছে। এ সময় আমাদের উচিত ওদের নিয়ে চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশা করা, দাদু-নানু থাকলে তো কথাই নেই। কেবল শুয়ে-ঘুমিয়ে বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে ছুটি না কাটিয়ে ছুটিটাকে কতটা অর্থবহ করা যায়, সে চেষ্টা করা উচিত।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সিফাত ই সাঈদ বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব আসলে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে জোরদার করার একটা সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। কেবল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই নয়, বন্ধু, সহকর্মী, প্রতিবেশী—সবার সঙ্গেই ঝিমিয়ে আসা যোগাযোগ নতুন করে ঝালাই করা যায় এ সময়। সারা বছর অফিস, কাজ, বাচ্চাদের স্কুলের পরীক্ষা নিয়ে নাভিশ্বাস, সবার খোঁজখবর করার সময় কোথায়? ছুটির সময়টা হতে পারে সেই সময়। কিন্তু এই মেলামেশাটা যেন সব লেবেলেই হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে। আপনার কাজিনের বাড়িতে গিয়ে আপনি হয়তো পুরোনো দিনের মতো আড্ডা-হাসিতে মেতে উঠেছেন কিন্তু আপনাদের সন্তানেরা যার যার মতো মোবাইল ফোন বা আইপ্যাড নিয়ে বসে রইল, তাতে কিন্তু হলো না। অংশগ্রহণ বাড়াতে নানা রকম আইডিয়াও বের করা যায়। যেমন বৃহত্তর পরিবার মিলে কোথাও পিকনিক করতে গেলেন, সেখানে সব বয়সের খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকবে। কিংবা বাড়িতেও গেট টুগেদারে তাদের জন্য আলাদা কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা করা হলো।
উৎসব-অনুষ্ঠানে কেবল অন্যদের সঙ্গে নয়, নিজের পরিবারের ভেতরকার ভুল-বোঝাবুঝি বা সমস্যাগুলোও শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
সূত্র: প্রথম আলো
COMMENTS